বৃহস্পতিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৬

সেই রক্তাক্ত বর্ষবরণ....রক্তাক্ত রমনা উদ্যান



প্রসেনজিৎ চৌধুরী:

বর্ষবরণ৷ নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছেন বাঙালিরা৷ ১৪২৩ বঙ্গাব্দকে উৎসবে অভিনন্দিত করতে চলছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান৷ মহানগর কলকাতা, ঢাকা ও দূর বাংলার আগরতলায় পালিত হচ্ছে বর্ষবরণ৷  শুধু তাই নয়৷ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিরাও ১৪২৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিয়েছেন৷ বৈশাখের প্রথম দিনের শুভেচ্ছা তিস্তা, মেঘনা, ময়ূরাক্ষীর কোল ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র৷
১৫ বছর আগে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল৷ সেদিনও একইরকম সবকিছু চলছিল৷ খুশিতে মেতেছিলেন বাঙালিরা৷ নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রতিটি মুহূর্ত তখন রঙিন ওপার বাংলায়৷ রাজধানী ঢাকার বিখ্যাত রমনা উদ্যানের অতি পরিচিত বটমূলে চলছিল সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে বর্ষবরণের পালা৷ আয়োজক বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট৷ প্রতি বছরের মত সেই অনুষ্ঠান দেখতে হাজির ছিলেন শতাধিক দর্শক৷
রমনা উদ্যান ছাড়িয়ে সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার সেহরাওয়ার্দি উদ্যান, বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বর৷  রমনার মূল মঞ্চে তখন সমবেত সঙ্গীত..এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়...তখন সকাল ৮টা৷ হঠাৎ দুটি বিস্ফোরণ হয় সেই অনুষ্ঠানে৷ মুহূর্তে প্রবল আতঙ্ক ঘিরে ধরে উৎসব প্রাঙ্গন৷ চারিদিকে হুড়োহুড়ি ও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন৷ অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন৷ তাদের ক্যামেরায় বিস্ফোরণের ছবি দেখে ততক্ষণে স্তম্ভিত গোটা ওপার বাংলা৷  কিছুপর ধোঁয়া কাটতেই দেখা যায় রমনার বটমূলে মৃতদেহের স্তূপ পড়ে রয়েছে৷ আহতদের চিৎকার ও রক্তাক্ত দেহে কেউ বাঁচার জন্য সাহায্য চাইছেন৷

এক রক্তাক্ত সকাল৷ নাশকতায় মৃতদের উপর দিয়েই নতুন বাংলা বছরে পা দিয়েছিলেন ওপারের বাঙালিরা৷  ১৫ বছর আগে সেই নাশকতা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত৷  কট্টরপন্থী জঙ্গি সংগঠন হরকত উল জিহাদি আল ইসলামি (হুজি) অনুষ্ঠানের আগে রমনার বটমূলে বোমা পুঁতে রেখেছিল৷ দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে দুটি বোমা ফাটানো হয়৷ তাতেই মারা যান ১০ জন৷ তদন্তে নেমে বাংলাদেশ পুলিশ আরও কয়েকটি বোমা উদ্ধার করে৷ সবকটি বোমা একসঙ্গে ফাটলে মৃতের তালিকা আরও দীর্ঘ হত৷
২০০৯ সালে হুজি জঙ্গি সংগঠনের প্রধান আব্দুল হান্নানসহ আরও সাত জঙ্গির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে তদন্ত শুরু হয়৷ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে৷ রমনা বটমূল বিস্ফোরণ মামলায় এই আট জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালত৷ এদের মধ্যে পাঁচ জন এখনও নিখোঁজ৷ নাশকতায় মূল অভিযুক্ত হুজি জঙ্গি গোষ্ঠীর যুক্তি ছিল- বাংলা বর্ষবরণ ইসলাম বিরোধী৷ তারই প্রতিবাদে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে৷  
বঙ্গাব্দের বর্ষের সূচনা হয়েছিল মুঘল বাদশা আকবরের সময় থেকে৷ দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি জাতি বৈশাখ বন্দনায় নতুন বছরকে স্বাগত জানান৷ সেই রীতির প্রবল সমালোচক কট্টরপন্থী ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলি৷ মর্মান্তিক সেই রমনা বটমূল বিস্ফোরণের (২০০১, ১৪ এপ্রিল) ১৫ বছর পরও নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে ঢাকায়৷ প্রশাসনিক নির্দেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করা হবে৷ কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই কাতারে কাতারে মানুষ বৈশাখের প্রথম দিনটিকে বরণ করেছেন গানে-কবিতায়৷  পদ্মা তীরের পূর্ব বাংলা থেকে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী শুভ নববর্ষের সেই বার্তা ছড়িয়েছে গঙ্গা তীরের পশ্চিম বাংলায়৷







কোন মন্তব্য নেই: