প্রসেনজিৎ চৌধুরী:
বর্ষবরণ৷ নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছেন বাঙালিরা৷ ১৪২৩ বঙ্গাব্দকে
উৎসবে অভিনন্দিত করতে চলছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান৷ মহানগর কলকাতা, ঢাকা ও দূর বাংলার আগরতলায়
পালিত হচ্ছে বর্ষবরণ৷ শুধু তাই নয়৷ বিভিন্ন
দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিরাও ১৪২৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিয়েছেন৷ বৈশাখের প্রথম
দিনের শুভেচ্ছা তিস্তা, মেঘনা, ময়ূরাক্ষীর কোল ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র৷
১৫ বছর আগে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল৷ সেদিনও একইরকম সবকিছু চলছিল৷
খুশিতে মেতেছিলেন বাঙালিরা৷ নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রতিটি মুহূর্ত তখন রঙিন ওপার
বাংলায়৷ রাজধানী ঢাকার বিখ্যাত রমনা উদ্যানের অতি পরিচিত বটমূলে চলছিল সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে
বর্ষবরণের পালা৷ আয়োজক বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’৷ প্রতি বছরের মত সেই
অনুষ্ঠান দেখতে হাজির ছিলেন শতাধিক দর্শক৷
রমনা উদ্যান ছাড়িয়ে সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার সেহরাওয়ার্দি
উদ্যান, বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বর৷
রমনার মূল মঞ্চে তখন সমবেত সঙ্গীত..‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়...’ তখন সকাল ৮টা৷ হঠাৎ দুটি
বিস্ফোরণ হয় সেই অনুষ্ঠানে৷ মুহূর্তে প্রবল আতঙ্ক ঘিরে ধরে উৎসব প্রাঙ্গন৷ চারিদিকে
হুড়োহুড়ি ও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন৷ অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন৷
তাদের ক্যামেরায় বিস্ফোরণের ছবি দেখে ততক্ষণে স্তম্ভিত গোটা ওপার বাংলা৷ কিছুপর ধোঁয়া কাটতেই দেখা যায় রমনার বটমূলে মৃতদেহের
স্তূপ পড়ে রয়েছে৷ আহতদের চিৎকার ও রক্তাক্ত দেহে কেউ বাঁচার জন্য সাহায্য চাইছেন৷
এক রক্তাক্ত সকাল৷ নাশকতায় মৃতদের উপর দিয়েই নতুন বাংলা বছরে
পা দিয়েছিলেন ওপারের বাঙালিরা৷ ১৫ বছর আগে
সেই নাশকতা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত৷ কট্টরপন্থী
জঙ্গি সংগঠন হরকত উল জিহাদি আল ইসলামি (হুজি) অনুষ্ঠানের আগে রমনার বটমূলে বোমা পুঁতে
রেখেছিল৷ দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে দুটি বোমা ফাটানো হয়৷ তাতেই মারা যান
১০ জন৷ তদন্তে নেমে বাংলাদেশ পুলিশ আরও কয়েকটি বোমা উদ্ধার করে৷ সবকটি বোমা একসঙ্গে
ফাটলে মৃতের তালিকা আরও দীর্ঘ হত৷
২০০৯ সালে হুজি জঙ্গি সংগঠনের প্রধান আব্দুল হান্নানসহ আরও সাত
জঙ্গির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে তদন্ত শুরু হয়৷ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে৷
রমনা বটমূল বিস্ফোরণ মামলায় এই আট জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছে ঢাকার অতিরিক্ত
মহানগর দায়রা আদালত৷ এদের মধ্যে পাঁচ জন এখনও নিখোঁজ৷ নাশকতায় মূল অভিযুক্ত হুজি
জঙ্গি গোষ্ঠীর যুক্তি ছিল- বাংলা বর্ষবরণ ইসলাম বিরোধী৷ তারই প্রতিবাদে বিস্ফোরণ ঘটানো
হয়েছে৷
বঙ্গাব্দের বর্ষের সূচনা হয়েছিল মুঘল বাদশা আকবরের সময় থেকে৷
দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি জাতি বৈশাখ বন্দনায় নতুন বছরকে স্বাগত জানান৷ সেই রীতির প্রবল
সমালোচক কট্টরপন্থী ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলি৷ মর্মান্তিক সেই রমনা বটমূল বিস্ফোরণের
(২০০১, ১৪ এপ্রিল) ১৫ বছর পরও নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে ঢাকায়৷ প্রশাসনিক
নির্দেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করা হবে৷ কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই কাতারে
কাতারে মানুষ বৈশাখের প্রথম দিনটিকে বরণ করেছেন গানে-কবিতায়৷ পদ্মা তীরের পূর্ব বাংলা থেকে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী
শুভ নববর্ষের সেই বার্তা ছড়িয়েছে গঙ্গা তীরের পশ্চিম বাংলায়৷

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন